Short Stories 1 - পারমিতা দাশগুপ্তা

সম্বিত ফিরল একজন টিচারের প্রশ্নে---"এর আগে তুমি কোন্ স্কুলে পড়তে?" কোনরকমে জবাব দিলাম, দমদম ক্রাইস্টচার্চ গার্লস হাই স্কুল"। কত ভয় নিয়ে একদিন স্কুলের মানে বুঝতে বাবার হাত ধরে এক বিশাল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সালটা ১৯৫৬। বাবা বললেন "এই তোমার স্কুল"। উপরে তাকিয়ে স্কুলের নাম টা পড়ার চেষ্টা করেছিলাম ,।পারিনি বাবা বললেন" দমদম ক্রাইস্টচার্চ গার্লস হাই স্কুল"। বাবার কথা বলার ধরণ টা এমনই ছিল যে একবার শুনেই আমার নামটা মনের মধ্যে গেঁথে গিয়েছিলো।
আমার কথায় টিচার একটু হেসে জবাব দিলেন"আমাদের স্কুলের নাম তুমি জানো?"আমি মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিলাম"না জানিনা"টিচার ধীরে ধীরে নামটা বলে গেলেন---'মহারানী কাশীশ্বরী গার্লস হাই স্কুল। মনে থাকবে তো?'' কিছুক্ষণ পরে বাবা ঘরে এসে আমার পাশে বসলেন। টিচারের দিকে তাকিয়ে বললেন ''আমি ফর্ম ফিলাপ করে দিয়ে এসেছি। আপনাদের হেড মিস্ট্রেস মিস দাশ গুপ্তার সঙ্গে যদি একটু কথা বলতে পারতাম খুব ভালো হতো ,আচ্ছা আপনি তো অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমিস্ট্রেস''?''হ্যাঁ ''আমি শুক্লা সেন, ওঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট। আপনি একটু বসুন উনি এক্ষুনি এসে পড়বেন। বাবা আমায় বাইরে যাবার জন্য ইশারাকরতে আমরা বেরিয়ে এলাম একটা বিরাট মাঠের সামনে। সেখানে মেয়েরা লাইনে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে গান গাইছে। গানটা আমার একদম ভালো লাগেনি, ঘুম আসছিল। আমি ভেতরের দিকে তাকাতেই বাবা হয়তো বুঝলেন যে আমার কিছু চাই। আমার কিছু বলার আগেই বাবা কাউকে এক গ্লাস জল আনতে বললেন। একটু পরে আমি বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম একজন মহিলা অফিস ঘরের দিকে আসছেন ,আমি বাবার হাতটা ধরলাম। ওনার সঙ্গে আমরা একটা অন্য ঘরে আসলাম। উনি বাবাকে নমস্কার করে বসতে বললেন। কথাবার্তা ঠিকই বুঝতে পারলাম উনি হেড মিস মানে পারমিতা দাশগুপ্তা। ওঁদের কথাবার্তা দিকে আমার একদম মন ছিলোনা ,কতক্ষণে বাড়িতে যাব মনটা ছটফট করছিল। চেয়ারে প্রায় ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। বাবা আমাকে হাত ধরে দাঁড় করালেন বললেন চলো স্কুলটা আমরা একবার ঘুরে দেখি। আমি বাইরে এসে চার-পাঁচটা একবার দেখে নিয়ে বললাম'' বাবা, এখন বাড়ি চলো পরে স্কুল দেখব''। বাবা হেসে জবাব দিলেন'' খুকু ,কাল থেকে তোমাকে এখানে পড়তে আসতে হবে , স্কুল দেখার সময় কখন পাবে?''আমার মাথাটা ঘুরছিল ,কোন জবাব না দিয়ে সোজা হেঁটে চলে এলাম গেটের সামনে। লাল রংয়ের মরিস গাড়ির সামনে রামচরণ পায়চারি করছিল, আমায় দেখতে পেয়ে হাত ধরে নিয়ে গাড়িতে বসিয়ে দিল। বাবা এসে বসলেন ,আমার মাথায় হাত রেখে বললেন''হেড মিস জানতে চেয়েছেন নাচ-গান -খেলাধুলা কোনটা তোমার বেশি ভালো লাগে, আমি কিন্তু ওঁকে সত্যি কথা বলেছি । স্পোর্টসে তোমার এত আগ্রহ ওঁরা তোমাকে বিভিন্ন কম্পিটিশনে পাঠাবেন ,কিন্তু পড়ার দিকেও তোমায় মন দিতে হবে।''বাবার কথা গুলো মনে হল অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে, আমি চোখ বুঝলাম।

খুব কষ্ট করে বইয়ের পাতায় চোখ রেখে ক্লাস টু এর পড়া শুরু করলাম। মনটা ছটফট করতো কতক্ষণে হেড মিসকে আবার দেখতে পাবো। অন্যান্য মেয়েদের কাছে খবর নিলাম উনি পড়াতে আসেন না শুধু মাঝে মাঝে সবাইকে একবার করে দেখে যান, কারোর সঙ্গে কথা বলেন না । কারোর যদি কিছু বলার থাকে তবে তা প্রথমে শুক্লা মিসকে বলতে হয়, উনি হেড মিসের কাছে নিয়ে যান। এ ব্যাপারটা আমাকে এতটুকুও উৎসাহিত করল না সেদিন ,শুধু বুঝলাম হেড মিস অনেক দূরের মানুষ।
এক বছর কেটে গেল। একদিন শুক্লা মিস আমাকে ডাকলেন বললেন,''চলো রত্না ,তোমাকে হেড মিস্ ডাকছেন''। কথাটা শুনেই আমার গলা শুকিয়ে গেল। কিন্তু সেই বয়সেও নিজের ভেতরেই যাই হোক না কেন আমি তা প্রকাশ করতাম না। ক্লাসের মেয়েদের নজর তখন শুধু আমার দিকে। সামনের বিশাল প্যাসেজ পেরিয়ে আমরা হেড মিসেরঘরের সামনে এসে দাঁড়ালাম। কাচের জানালা দিয়ে ওঁকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। উনি আমাদের ভেতরে আসতে বললে দুরুদুরু বুকে ওঁর সামনের চেয়ারটায় গিয়ে বসলাম। শুক্লা মিস দাঁড়িয়েই রইলেন,হেড মিস ওঁর হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে আমায় পাশে এসে বসতে বললেন। ওঁর কথা আমার সম্বিত ফিরল."তুমি গান জানো ,নাচ করতে পারো ,আবার এত সুন্দর অভিনয়ও করো। কি শিখিয়েছেন এসব?"আমি মাথা নীচু করে জবাব দিলাম "মা"।"ভেরি গুড, আমাদের স্কুলের ফাংশনে তোমাকে আমরা ডেকে নেব, অসীমা মিস তোমাকে দেখিয়ে দেবেন কি করতে হবে। ভালো কথা, তুমিতো লংজাম্পে ডিস্ট্রিক্ট চ্যাম্পিয়ন হয়েছো, আরেকটা কম্পিটিশন আসছে, স্কুলের মধ্যে প্রাক্টিস শুরু করে দাও। মেডেল নিয়ে আসতে হবে কিন্তু।"শুক্লা মিস আমার দিকে তাকিয়ে বললেন"ও স্পোর্টস পিরিয়েডে যাতে ভালো করে প্র্যাকটিস করতে পারে তা আমি দেখব।"

সমস্ত ব্যাপারটা আমার কাছে এতই অপ্রত্যাশিত ছিল যে হেডমিস কে একটা ধন্যবাদও বলতে পারলাম না। বাইরে এসে শুক্লা মিস আমাকে মনে করিয়ে দিলেন এরপর থেকে যখন কেউ আমার প্রশংসা করবেন তখন তাঁকে থ্যাংক ইউ বলতে যেন ভুলে না যাই।
সেদিন বাড়িতে এসে বাবা-মাকে পুরো ঘটনাটা বললাম। দুজনে খুব খুশী হলেন। ছোট বয়স থেকেই আমার রাত্রে ভালো ঘুম হত না, কেন জানিনা সেদিন রাত্রে আমি কোন বাজে স্বপ্ন না দেখে ঘুমিয়ে ছিলাম। মাঝখানে বিশাল বড় একটা মাঠ আর তার চারপাশে এক তলা ছোট ছোট বাড়ি যেটাকে বলা হতো স্কয়ার ব্যারাক। আমাদের বাড়িটা ছিলো নর্থ এর শুরুতে। মাকে ঠিকানা বলতে শুনতাম 2০, নর্থ স্কোয়্যার ব্যারক। দিন পনেরোর মধ্যে স্কুলের ফাংশন এর প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল। পাড়ার দুর্গাপুজোর ছোটদের নাটকেও অংশ নিলাম। সেন্ট্রাল জেলে মা আমাকে দিয়ে রবীন্দ্রনাথের পূজারিণী কবিতা নিয়ে ডান্স ড্রামা করালেন। আমি শ্রীমতীর চরিত্রে অভিনয় এবং নাচ করে সকলের কাছ থেকে ভূয়শী প্রশংসা পেলাম। এরপরে রোটারী ক্লাবের তরফ থেকে আমাদের ডাকা হল। সেখানে আমায় শ্রীমতির চরিত্রে নেওয়া হলো না, কারন আমার বড় চুল ছিল না। আমাকে কুমারী শুক্লার চরিত্রে নেয়া হলো। ফাংশনের দিন হেড মিস কে প্রথম সারিতে দেখে আমার খুব ভালো লাগলো। আমার অভিনয় ওঁর কতোটা ভালো লাগলো সেটা বুঝতে পারলাম না। যাইহোক কদিন পরে আবার আমার ডাক পড়লো ওঁর ঘরে । উনি চিরাচরিত ভঙ্গিতে পায়চারি করতে করতে বললেন"তুমি যা করো খুব মন দিয়ে করো এরপরে আরো বড় চরিত্র পাবে তখন একটু জোরে বোলো, পিছনের সারি থেকেও যেন সকলে শুনতে পান। উনি জানতে চাইলেন যে আমার সামনে আর কোন ফাংশন আছে কিনা। আমি বললাম "সরস্বতী পুজোর আগে বোধহয় আর কোন ফাংশন নেই। সেই সময় হয়তো আবার নাটক হবে।"ক্লাসে এসে হেড মিসকে নিয়ে অনেক কিছু ভাবছিলাম। ওঁর হাঁটাচলা, কথাবার্তা সবকিছু আমার মনের ভিতর নানা প্রশ্ন জাগালো। একটা কথাই মনে হচ্ছিল যে উনি বাইরে থেকে যতটা কঠিন, রাগি বোলে মনে হয় ভেতর থেকে তা একেবারেই নন। রাত্তিরে শোবার পর মাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে জিজ্ঞেস করলাম"মা, হেড মিস খুব ভালো না? উনি আমাকে ভালোবাসবেন তো?"সারাদিনের পরিশ্রমের পর মা ওই সময় হয়তো এর সঠিক উত্তরটা দিতে পারলেন না, শুধু বললেন"কেন ভালোবাসবেন না? উনি যা বলবেন সব সময় তা শুনবে।"

এর বেশ কিছুদিন পর একদিন স্পোর্টস প্র্যাকটিস করতে করতে পড়ে গেলাম। হাটুতে খুব ভালো রকম চোট লেগেছিল, খবর পেয়ে ছুটে এলেন ঠিকমতো ফার্স্ট এড হয়েছে কিনা দেখার জন্য । কম্পিটিশনের ঠিক 7 দিন আগে এরকম ঘটনা আমাকে খুব ভাবিয়ে তুলল। সেদিন বাড়িতে গিয়ে জানতে পারলাম উনি বাবাকে ফোন করে বলেছেন আমি যেন তিন-চারদিন বাড়িতে একেবারে বিশ্রামে থাকি। মনটা খুব দমে গেল । ঠিক এক বছর আগে আমি লংজাম্পে ডিস্ট্রিক্ট চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম, এবারের কম্পেটিশানটা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু পায়ের ব্যথা না কমলে দৌড়াতে পারবো না। চারদিন খুব চিন্তায় কাটলো। ফাইনালের দিন আমি পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধেই গেলাম। উনি দূর থেকে সব দেখছিলেন। একটা মিরকল হলো সেদিন ।

আমি ১০০ মিটার রানে ফাস্ট হলাম। উনি সিট থেকে উঠে এসে আমাকে দু'হাতে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন "আমি জানতাম তুমি পারবে, পায়ে লাগেনি তো?"আমি আমার আবেগ কে লুকিয়ে রাখতে পারলাম না, অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে ওঁর পায়ের উপর হাত রেখে বললাম" না মিস ,আমার একটুও লাগেনি, পায়ের ব্যথা একদম ঠিক হয়ে গেছে। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে চোখেমুখে জল দিলাম , একটা গ্লাসে ফ্রুট জুস শুক্লা আমার হাতে দিলেন। দূর থেকে দেখলাম মাও চোখের জল মুছে হেড মিসের কাছে গিয়ে হ্যান্ডশেক করলেন। কিছুক্ষণ পরে হেড মিস আমাকে নিয়ে এলেন সেদিনের চিফ গেস্টের সামনে, আমার হাত ধরে বললেন" মিট আওয়ার বেস্ট স্টুডেন্ট, রত্না চক্রবর্তী, প্রাইড অফ আওয়ার স্কুল"। আমার চোখের জল সেদিন আর বাধা মানছিলনা। প্রাইজ নিয়ে বাড়ি আসার সময় আমি হেড মিসকে বললাম,"সামনের সপ্তাহে ইন্টার স্কুল, আমি আবার ফার্স্ট হয়ে স্কুল স্কুলের জন্য কাপ নিয়ে আসব"। তারপরে যা ঘটলো তা আমার মনের ভিতর একটা বিশেষ জায়গায় চিরজীবনের মতো রয়ে গেল। হেড মিস তাঁর ব্যাগের মধ্যে থেকে রুমাল বার করে আমার চোখ মুছে দিলেন। সেদিন আমার মনে হয়েছিল যে আমি একটা বিরাট কিছু পেয়ে গেছি। আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধি দিয়ে বেশি কিছু বিশ্লেষণ করতে পারিনি, কিন্তু এটুকু বুঝে ছিলাম যে আমার ভবিষ্যতের ভিত্তিপ্রস্তর হেড মিস সেদিন স্থাপন করে দিলেন। আজও তাঁর কতগুলো কথা, ব্যক্তিত্ব আমায় পথ দেখিয়ে চলেছে। সেদিন রাত্তিরেই মাকে আমার মনের কথা আমার স্বপ্ন জানিয়ে দিলাম।"মা আমি বড় হয়ে হেড মিসের মত হব। তুমি দেখলে উনি আমার চোখের জল মুছে দিলেন, আমাকে উনি খুব ভালোবাসেন, তাই না মা?"মা আমার মাথায় হাত রেখে বললেন"সত্যিই ওর মতন মানুষ হয় না, উনি তোমায় যা করতে বলবেন সেটা করবে, ভগবান করুন তুমি আরো কয়েকটা বছর এস্কুলেই পড়তে পারো"আমি ভয়ে ভয়ে মাকে জিজ্ঞেস করলাম "কেন মা এখানে পড়বো না তো কোথায় পড়বো ?"মা একটু থেমে আমার একটা কঠিন সত্যির সামনে এনে দাঁড় করালেন।"না মানে তোমার বাবার যদি অন্য কোথাও বদলি হয়ে যায় তখন তো আমরা বহরমপুরে থাকতে পারবো না"।মার কথা শুনে আমার বুকের মধ্যে কেমন ব্যথা করে উঠলো"সেকি মা বাবার কোথায় বদলি হবে? কোথায় যাব আমরা?।"মা আমাকে বুঝিয়ে দিলেন যে সরকারি চাকরিতে যেখানে যাবার অর্ডার আসে সেখানে যেতে হয় ,এক জায়গায় বেশিদিন থাকা যায় না।

পরদিন সকালে বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন "খুকু তোমার অ্যানুয়াল পরীক্ষার আর কত দেরি?"বললাম," চার মাস"। বাবা বললেন"খুকু আমি চেষ্টা করব যাতে তোমার পরীক্ষা হয়ে যাবার পরই আমাদের কলকাতা যাবার দিন স্থির হয়"। চোখের জলকে সেদিন ধরে রাখতে পারিনি। স্কুলে গিয়ে কারুর সঙ্গে কথা বলিনি, হেড মিসের ঘরের সামনে দিয়ে দু'তিনবার ঘুরে এলাম। সেদিন ওঁর ঘরে অনেক লোক ছিল। একা মাঠের বেঞ্চে অনেকক্ষণ বসে ছিলাম। হেড মিসের সঙ্গে কথা বলা হলো না। বাড়িতে এসে না খেয়ে শুতে চলে গেলাম। শুয়ে শুয়ে শুনলাম মা বাবাকে বললেন"
" আমার মনে হচ্ছে ও স্কুল আর ওর হেডমিসকে ছেড়ে যাবার কথা ভাবতে পারছেনা, কি হবে এখন?"বাবা আমার মাথার কাছে এসে বসে বললেন",, খুকু কি করবো বলো, আমার ডিপার্টমেন্ট আমাকে যেখানে পাঠাচ্ছে সেখানে আমি যাব না এ কথা বলতে পারবোনা। ওখানে মানে কোলকাতায় আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে এতদিন এইচ ডব্লিউ শিয়া কাজ করছিলেন এখন উনি নিজের দেশে ফিরে যাবেন মানে ইউরোপে ফিরে যাবেন। আমাকে সেখানে গিয়েই চার্জ নিতে হবে। তুমি বুঝতে পারছ আমি কি বলছি?"মা বাবাকে বললেন ছেড়ে যাও এখন ওকে ঘুমোতে দাও। তোমার কথা ও কিছুই বুঝতে পারিনি, ওর বোঝার দরকারও নেই। আমি কাল ওর সঙ্গে কথা বলব। আমি সেদিন বাবার কথাগুলো শুধু শুনেই গিয়েছিলাম শুধু এইটুকু বুঝেছিলাম যে আমাদের বহরমপুরে বেশী দিন থাকা হবে না।

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতে দেখি ঘরে বাবা মা ছাড়া আরও দু'তিনজন রয়েছেন। সকলের কথাবার্তা শুনে এটুকুই বুঝলাম যে আমার প্রচন্ড জ্বর হয়েছিল তাই সকালে ডাক্তার ডাকা হয়েছে এবং একজন নার্সও এসেছে আমাকে দেখাশোনা জন্য। তিন দিন প্রায় বিছানায় শুয়েই কাটলো।চারদিনের দিন ঘুম থেকে উঠে দেখি বিছানার পাশের চেয়ারে হেড মিস বসে আছেন। মা দাঁড়িয়েছিলেন ওঁর পাশে চায়ের কাপ হাতে করে।
মা হেড মিসকে বললেন"একটু চা নিন, আপনাকে দেখেছে তো, এখন খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবে।"মার কথায় হেড মিস কোন জবাব দিলেন না ,।শুধু বললেন "ওকে খুব দুর্বল দেখাচ্ছে, আরো কটা দিন রেস্ট নিক, এখন স্কুলের কোন তাড়া নেই। আমি আজ উঠি, ও কেমন থাকে মিস্টার চক্রবর্তী কে বলবেন আমায় যেন জানিয়ে দেন।"আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।

পরের চার মাস প্রতিদিনকার রুটিন প্রায় একই রকম ছিল। পড়ায় একটু সাহায্য হবে তার জন্য একজন মাস্টার মশাই এলেন। কেন জানিনা আমার তখনকার মানসিক অবস্থার জন্যই হয়তো আমি তাঁকে একসেপ্ট করতে পারিনি। প্রতিদিন তার একটাই কথা আমায় খুব কষ্ট দিতো--"তুমি যদি ভালো নম্বর না পাও তাহলে কলকাতায় বড় স্কুলে কি করে ভর্তি হবে? আমি তাঁকে বোঝাতে পারিনি যে আমার পক্ষে কলকাতার কোন স্কুলেই মানিয়ে নেওয়া কত কঠিন হবে। যেখানে হেডমিস নেই সেটা আমার কাছে কোন স্কুলই নয়। কাউকেই আমার সেদিনকার মনের অবস্থা ,এই যন্ত্রণা জানাতে পারিনি। যথাসময়ে পরীক্ষা দিলাম, কি লিখলাম জানিনা বাবা বললেন তোমার রেজাল্ট জানা পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করতে পারব না। যেদিন স্কুলে শেষবার গেলাম শুক্লা মিস বললেন"তুমি তোমাদের যাবার আগেরদিন একবার স্কুলেএসো, হেড মিস তোমায় আসতে বলেছেন।"আমার মনের ভেতরকার অবস্থা সেদিন কেউ বুঝতে পারিনি,। বাবা-মাকেও কিছু বলতে পারিনি । জীবনের সেইদিনটা আজও ভুলিনি। শরীর তখনও পুরোপুরি ঠিক হয়নি তাই ড্রাইভার আমায় নিয়ে গেল স্কুলে। স্কুলে সেদিন কেউ ছিলনা বিকেল ছ'টার সময় মাঠ পেরিয়ে টিচারদের কোয়াটারের সামনে এসে শুক্লা মিস কে ডাকলাম। উনি বাইরে এসে জিজ্ঞেস করলেন "কবে যাচ্ছো
তোমরা?এখন শরীর কেমন? কলকাতায় কোন স্কুলে পড়বে কিছু ঠিক হয়েছে?"ওর কোন কথাই আমার কানে গেল না, আমি চারদিকে শুধু হেড মিস কে খুঁজেছিলাম। শুক্লা মিস হয়তো আমার মনের অবস্থাটা বুঝলেন ,বললেন" হ্যাঁ, আজ হেড মিস আসতে পারেননি ওঁর শরীর ভালো নেই, উনি বলেছেন তোমার রেজাল্ট এবং টিসি তোমার বাবার কাছে পাঠিয়ে দেবেন। উনি তোমায় খুব মন দিয়ে পড়াশোনা করতে বলেছেন"।শুক্লা মিসের হাতে কয়েকটা প্যাকেট ছিল, উনি আমার হাতে দিয়ে বললেন "স্পোর্টসটা কিন্তু ছেড়ো না।"আমি আর এক মুহূর্তও দাঁড়াই নি, ছুটে গাড়িতে গিয়ে বসলাম। ড্রাইভার আমার হাত থেকে প্যাকেটগুলো নিয়ে সামনের সিটে রেখে দিল। সমস্ত শক্তি দিয়ে কান্না চেপে ড্রাইভারকে বললাম "বাড়ি চলো"। শরীর খুব দুর্বল লাগছিল, বাড়ি ফিরে সোজা শুতে চলে গেলাম।

যাবার দুদিন আগে বাবা অফিসে বেরিয়ে যেতে মা একদিকে প্যাকিংয়ের কাজ তদারক করছিলেন, ঘরের এক কোণে আমায় চুপ করে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন"ক'দিন ধরে প্যাকেটগুলো ওই ভাবেই পড়ে আছে তুমি খুলে পর্যন্ত দেখলে না, কি করব, এগুলোও প্যাকিং এ দিয়ে দেব তো?"যা ইচ্ছে করো--"আমার সিদ্ধান্ত মাকে জানিয়ে আমি বারান্দায় বাবার ইজি চেয়ারে গিয়ে বসলাম। আমার মনি তখন শুধু একটাই প্রশ্ন কি করে আমি অন্য স্কুলে গিয়ে মন দিয়ে পড়াশোনা করব। বহরমপুরে আমার একমাত্র বন্ধু মান্তু কে ছেড়ে অন্য কোন মেয়েকে কি করে অত কাছের ভাববো! ১১ বছর বয়সে আমি এইসব প্রশ্নের কোন জবাব খুঁজে পাইনি। পরীর দুটো দিন খুব ব্যস্ততার মধ্যে কাটলো সকলের। মেজদা, সেজদা ,ছোড়দা আমার ছোট বোন কারুর কাছেই আমার মন খারাপ তেমন কোনো বিশেষ ঘটনা বলে মনে হয়নি। আমিই শুধু সকলের থেকে আলাদা ছিলাম। যাবার দিন সকালে মা জানতে চাইলেন আমার স্কুল থেকে আনা প্যাকেটগুলো আমি খুলে দেখব কিনা তা না হলে যে বক্সে ওগুলো রাখা হয়েছে সেটা বন্ধ করে দেয়া হবে। আমি জামা বদলে প্যাকেটগুলো হাতি করে মান্তুর কাছে চলে গেলাম।ও বারান্দায় চুপ করে বসে ছিল আমাকে দেখে ছুটে এসে দুই হাতে জড়িয়ে ধরল। আমরা দুজনে সেদিন প্রাণভরে চোখের জল ফেললাম। মান্তু জানতে চাইলো আমি ওকে ভুলে যাবো না তো? চিঠি লিখব তো? আমি কোন কথা না বলে ওর সামনে প্যাকেটগুলো রেখে জিজ্ঞেস করলাম" তুই আমাকে ভুলে যাবি নাতো?"ওর জবাব না শুনেই আমি সেদিন চলে এসেছিলাম।

পরের দিন সকালবেলা আমাদের জিনিসপত্র আগে রওনা হল। আমরা স্টেশনে পৌঁছলাম বেলা ১১টায়। ট্রেনের কামরায় বসে আমি দেখছিলাম যে অনেকেই এসেছেন বাবাকে বিদায় জানাতে। আমার কোন কিছু নিয়েই ভাবার মতো মানসিক অবস্থা ছিল না। শুধু মনে হচ্ছিল হেড মিস কি একবার আসবেন না আমায় বিদায় জানাতে? ট্রেন ছাড়লো যথাসময়ে। আমি ভাবছিলাম হয়তো আমার হেড মিস এর সঙ্গে কোন দিনও দেখা হবে না, কিন্তু আমার তাঁকে বলা হল না যে আমি বড় হয়ে ঠিক ওঁর মতন হব। বড় হয়ে যেদিন আমি কোন স্কুলের হেড মিস হব সেদিন ওর সঙ্গে দেখা করতে যাব, জানিনা উনি আমাকে চিনতে পারবেন কিনা। ওঁর কতগুলো কথা শুধু কানের মধ্যে বাজছিল--"মিট রত্না চক্রবর্তী, প্রাইড অফ আওয়ার স্কুল, সি ইজ আওয়ার বেস্ট স্টুডেন্ট"।
পরবর্তী জীবনে নানা উঠে পড়ার মধ্যে দিয়ে যা শিখেছি যা করেছি সবকিছুতেই পারমিতা দাস গুপ্তার অবদান রয়ে গেছে। তাঁর হাঁটাচলা ,কথা বলার ভঙ্গি ,মুখে একটা সুন্দর হাসির রেখা আমার চরিত্র গঠনে অনেকখানি সাহায্য করেছে। উনি কখনো জোরে হাসতেন না । ওঁর আভিজাত্যপূর্ণ চেহারাটা আজও চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে। উনি নিঃসন্দেহে আমার জীবনের ওইসব মানুষের মধ্যে একজন, ওনাকে আমি অন্তর থেকে শ্রদ্ধা করেছি। আমার মনের ভিতরে একটি বিশেষ জায়গায় উনি সর্বদা থাকবেন।