Short Stories 2 - 'বাবা' চারুচন্দ্র চক্রবর্তী ( জরাসন্ধ)

এই মানুষটির স্মৃতি আমার জীবনে একটি বিশেষ স্থানে আছে এবং আজীবন থাকবে।
শুধু আমার বাবা হিসেবে নন, একজন সাদা-কালোয় মেশানো মানুষের সব কথা , তাঁকে ঘিরে প্রতিটি ঘটনা এবং সর্বোপরি তাঁর দেখানো পথে আমি সর্বদা চলে এসেছি।
মার কাছে শোনা আমার জন্মের পর বাবার সুপারেনটেনডেন্টের পদে প্রমোশান এবং তার কিছু পরেই "।লৌহ কপাট "এর যাত্রা শুরু হয়েছিল।
তিন বছর বয়সের কথা কারোর স্পষ্ট মনে থাকে কিনা জানিনা, কিন্তু আমার মনে আছে। বাবা তখন আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের জেলার। আমরা জেলের ওপরে কোয়াটারে থাকতাম। বাড়িতে সর্বদা একজন ওয়াডার থাকতো বাড়ির বিভিন্ন কাজে মাকে সাহায্য করার জন্য। আমাকে দেখাশোনা করার দায়িত্ব তার উপরে কিছুটা ছাড়া হয়েছিল।
একদিন সে উপুড় হয়ে শুয়ে আমাকে তার পিঠে বসতে বলল। এই বয়সেও তার পিঠে বসে আমার কিরকম অস্বস্তি লাগছিল। আমি পিঠ থেকে নিচে নেমে বললাম "।তুমি খুব বাজে ঘোড়া, আমার ঘড়া চাইনা।"
এর দুদিন পরে মা ডাকলেন চান করতে যাবার জন্য। আমি পুতুল খেলছিলাম, রামচরণ এসে হঠাৎ আমার জামা প্যান্ট খোলার জন্য আমায় বাথরুমের দিকে নিয়ে যেতে আমি চিৎকার করে মাকে ডাকলাম। মা কিছুটা অবাক হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কি হয়েছে, রামচরণ ততক্ষণে অন্য ঘরে চলে গেছে। আমি মাকে বললাম "আমার লেগেছে ,রামচরণ খুব বাজে লোক"। সেই সময় আমার বয়সের বাচ্চাদের গুড টাচ, ব্যাড টাচ শেখানোর প্রচলন ছিল না। ঘটনাটা মা বাবাকে জানিয়ে ছিলেন। রামচরণ কে সরিয়ে একজন মাঝবয়সী ওয়াডারকে আনা হয়েছিল--বিন্দা সিং, বাবার অনেক দিনের পুরনো/ বিশ্বস্ত কর্মী।
বিন্দা আমায় সর্বদা দূর থেকে দেখত। সেই সময় আমি একটা নতুন খেলা শুরু করলাম। হাতে একটা ছোট লাঠি নিয়ে বিশাল বারান্দার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পায়চারি করতাম, আর চিৎকার করি সবাইকে শাসন করতাম।"ঠিক করে কাজ না করলেই মারবো"। বলাবাহুল্য মা এবং বৃন্দা দুজনে এই দৃশ্য আড়াল থেকে খুব উপভোগ করতেন।

'বাবা' শব্দটার অর্থ বুঝতে শুরু করলাম বহরমপুরে এ আমার স্কুল শুরু হবার পর থেকে। একদিন আমাদের বাড়িতে কিছু অতিথি এলেন। বাবা ততদিনে একজন স্বনামধন্য সাহিত্যিক হিসেবে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন। আমি মার কাছে জানতে চাইলাম এঁরাকারা আর কি জন্য এসেছেন। মা বোঝালেন "তোমার বাবা যে বইটা লিখেছেন তাই নিয়ে এঁরা সিনেমা বানাবেন।"আমি বাবা-মার সঙ্গে পথের পাঁচালী, টনসিল ,শ্রীবৎস চিন্তা দেখে নিয়েছিলাম। ঐরকম কিছু একটা যে ওঁরা বানাবেন সেটা বঝতে অসুবিধে হলো না। সাহিত্যিক সুধীরঞ্জন মুখার্জি, অভিনেত্রী মঞ্জু দে, পরিচালক তপন সিনহা বাবার সঙ্গে কি আলোচনা করতেন তাই নিয়ে আমার কৌতুহলের সীমা ছিল না। আমি রাত্তিরে মার কাছ থেকে শুনে নিতাম কি হচ্ছে আর কি হবে। একদিন রাত্রে খেতে খেতে বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম "তুমি কি লেখ? আমাকে শিখিয়ে দিও"। বাবা সেদিন আমায় খুব সহজ ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে চাকরি জীবনে তিনি যা কিছু দেখেছেন এবং জেনেছেন তাই লিখেছেন। এ কিছুদিনের মধ্যেই আমি 'লৌহ কপাট 'প্রথম পর্ব শেষ করলাম। ধীরে ধীরে আমি চারুচন্দ্র চক্রবর্তী কে চিনলাম জানলাম এবং মনে মনে ঠিক করে নিলাম যে জীবনে সুযোগ পেলে আমিও যা দেখবো জানবো তা নিয়ে লিখব। বাবার মতন অতটা গুছিয়ে লিখতে পারবো কিনা জানিনা কিন্তু লিখব একদিন নিশ্চয়ই।
আমায় মাঝে মাঝে ডাইরি লিখতে দেখে বাবা জিজ্ঞেস করতেন"কি লিখছো"আমি বলতাম "সকাল থেকে যা যা দেখেছি তাই লিখেছি"। মৃদু হেসে বাবা বললেন "খুব ভালো, তোমার দাদারা তো এসব নিয়ে কোনো দিন ভাবলো না, দ্যাখ তুমি যদি আমার জায়গাটা নিতে পারো"। সেদিন আমার চোখে জল এলো, শুধু বললাম" বাবা তুমি একটু শুনবে আমি কিরকম লিখেছি?"বাবা বলেছিলেন "একদিন নিশ্চয়ই শুনব আরো লেখ"।
দিন কেটে গেল জলের স্রোতের মতো। কুড়ি বছর বয়সে বাবা মাকে না জানিয়ে তিনজন সাক্ষী নিয়ে ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশন অফিসে গিয়ে একজন অতি সুদর্শন ইঞ্জিনিয়ারকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করলাম। যদিও বেশ কিছুদিন ধরে তাঁর আমাদের বাড়িতে আসা যাওয়া চলছিল তবুও বাবা-মা কেউ ভাবতে পারেননি তাঁদের অজান্তে আমি এত বড় সিদ্ধান্ত একা নিয়ে নেব। বাবা তিনতলার ঘরে আমাকে একা ডেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন"যেভাবে রেজিস্ট্রি ম্যারেজ হয় তা সব ঠিকভাবে হয়েছিল তো? পেপারটা আমাকে দেখিও"আমার বুক ফেটে কান্না এসেছিল সেদিন। পরবর্তী জীবনে নানা ওঠাপড়া মধ্যে দিয়ে একটা জিনিস আমি বুঝেছিলাম বাবা-মাকে না জানিয়ে আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তো ভুল হয়েছিল। ওই ঘটনাটা তাঁদের যথেষ্ট আঘাত দিয়েছিল। যদিও সামাজিক অনুষ্ঠানে আয়োজনের এ কোন ত্রুটি কোথাও ছিল না।

আমায় মাঝে মাঝে ডাইরি লিখতে দেখে বাবা জিজ্ঞেস করতেন"কি লিখছো"আমি বলতাম "সকাল থেকে যা যা দেখেছি তাই লিখেছি"। মৃদু হেসে বাবা বললেন "খুব ভালো, তোমার দাদারা তো এসব নিয়ে কোনো দিন ভাবলো না, দ্যাখ তুমি যদি আমার জায়গাটা নিতে পারো"। সেদিন আমার চোখে জল এলো, শুধু বললাম" বাবা তুমি একটু শুনবে আমি কিরকম লিখেছি?"বাবা বলেছিলেন "একদিন নিশ্চয়ই শুনব আরো লেখ"। দিন কেটে গেল জলের স্রোতের মতো। কুড়ি বছর বয়সে বাবা মাকে না জানিয়ে তিনজন সাক্ষী নিয়ে ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশন অফিসে গিয়ে একজন অতি সুদর্শন ইঞ্জিনিয়ারকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করলাম। যদিও বেশ কিছুদিন ধরে তাঁর আমাদের বাড়িতে আসা যাওয়া চলছিল তবুও বাবা-মা কেউ ভাবতে পারেননি তাঁদের অজান্তে আমি এত বড় সিদ্ধান্ত একা নিয়ে নেব। বাবা তিনতলার ঘরে আমাকে একা ডেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন"যেভাবে রেজিস্ট্রি ম্যারেজ হয় তা সব ঠিকভাবে হয়েছিল তো? পেপারটা আমাকে দেখিও"আমার বুক ফেটে কান্না এসেছিল সেদিন। পরবর্তী জীবনে নানা ওঠাপড়া মধ্যে দিয়ে একটা জিনিস আমি বুঝেছিলাম বাবা-মাকে না জানিয়ে আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তো ভুল হয়েছিল। ওই ঘটনাটা তাঁদের যথেষ্ট আঘাত দিয়েছিল। যদিও সামাজিক অনুষ্ঠানে আয়োজনের এ কোন ত্রুটি কোথাও ছিল না। কেটে গেল আরো কয়েকটা বছর। তখন আমি কলকাতায় স্বামী পুত্র-কন্যার নিয়ে সুখের সংসার করছি। একদিন রাত্তিরে আমাদের ল্যান্ড লেডি কাজের লোককে পাঠিয় জানতে চাইলেন আমি কি একবার বাপের বাড়িতে যেতে পারবো? প্রশ্নটা তাৎপর্য বুঝতে আমার বেশ কিছুক্ষণ সময় লেগে গেল। জানতে চাইলাম আমি ও বাড়িতে অত রাত্তিরে যাব কেন? সনাতন মাথা নিচু করে জবাব দিল "একটু গেলে ভাল হত আপনার বাবার শরীর খুব খারাপ। মা আপনাকে একবার ঘুরে আসতে বললেন।" মাথা টা কেমন ঘুরে গেল চেয়ারে বসে একটু ভেবে এক গ্লাস জল খেয়ে বড় পুত্রকে নিয়ে পাঁচ মিনিটের ভেতরে তৈরি হয়ে পৌঁছে গেলাম "অরুণাচলের "সামনে। বাড়ির সমস্ত আলোগুলো জ্বলছিল, একটা অজানা ভয় যেন আমাকে উপরে উঠতেই দিচ্ছিল না ।বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগলো আমার উপরে উঠতে। লাউঞ্জে দেখলাম অনেক লোক। আমার বিবেক বুদ্ধি তখন কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল, সামনে মা, দাদা ,বৌদি কাউকেই দেখতে পেলাম না ।কেমন যেন অন্যমনষ্ক হয়ে বাবার ঘরের সামনে এসে মাটিতে বসে পড়লাম। কে যেন আমার কানে কানে বললো "বড্ড দেরী হয়ে গেছে আর যে কিছুই করার নেই"। আমার ছোট দাদা কোথা থেকে হন্তদন্ত হয়ে দরজার সামনে এসে আমায় মাটিতে বসে থাকতে দেখে পাশ কাটিয়ে ঘরের মধ্যে গিয়ে বাবার খাটের পাশে দাঁড়িয়ে পড়ল। আমি বসে বসেই দেখছিলাম, বাবা তার খাটে শুয়ে আছেন, দুটো ঠোঁটের মাঝখানে একটু ফাঁক---হঠাৎ মনে হল যেন কিছু বলতে চাইছিলেন । অতি প্রিয় তসরের চাদর দিয়ে ঢেকে কেউ বুকের উপর হাত দুটো রেখে কিছু ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। হঠাৎ মনে হল মা কোথায়? মা বাবার রাইটিং টেবিলের পাশে চেয়ারে বসে ছিলেন। লাল পাড় শাড়ি আর মাথার সিঁদুর সব নিজের জায়গাতেই ছিল। আর এক মুহূর্ত বসে থাকতে পারিনি ওখানে। নীচে এসে ট্যাক্সি নেব বলে বড় রাস্তার দিকে ছুটতে লাগলাম , বড় পুত্র আমার আগে এসে চিৎকার করে বললো" মা পড়ে যাবে একটু দাঁড়াও, আমি ট্যাক্সি নিয়ে আসছি"। আমার সেই মুহূর্তের মানসিক অবস্থা কোন ভাষা দিয়ে প্রকাশ করার মত ছিল না। তখনকার সেই অনুভূতিটা আজও আমায় গভীর ঘুম থেকে জাগিয়ে দেয়, তখন মনে হয়েছিল আমি একটা মরুভূমিতে একা দাঁড়িয়ে আছি-আমার চারপাশে কেউ নেই। একটা ভয় /
আতঙ্ক আমাকে পঙ্গু করে দিল, আমি ট্যাক্সিতে উঠে জ্ঞান হারালাম।

সেদিন সারারাত আমি বারান্দায় দেওয়ালে একটা বালিশ নিয়ে সোজা হয়ে বসে ছিলাম। পতিদেবতা তার যথাযথ দায়িত্ব পালন করেছিলেন, বাচ্চাদের খাইয়ে শুইয়ে দিয়ে ছিলেন। আমি ১২বছর আগে পিছিয়ে গেলাম---বিয়ের পরের দিন সকালে আমার শ্বশুরবাড়ি যাত্রার আগে লাউঞ্জে বসে বাবা রথীনকে বলেছিলেন"। ইউ নো, খুকু ওয়াজ ভেরি কাইন্ড টু মি। কাল থেকে ওর মত আমার খেয়াল রাখার কেউ রইল না"। সেদিন আমি কাঁদতে পারি নি, একটা অব্যক্ত যন্ত্রনা আমায় ১২ বছর ধরে কষ্ট দিয়েছে। বাবার কতগুলো কথা আমার মনে এমন ভাবে জায়গা করে নিয়েছিল যা আমার মৃত্যুর আগের মুহূর্তেও মনে পড়বে। তার হাঁটা/চলা/কথা বলার ধরন সবটাই আমার মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে। বাবা চেয়েছিলেন আমি wbcs করে তাঁর পথে চলি। সেটা হয়নি, ভাগ্যের নির্দেশ অন্য কিছু ছিল। বাবা চেয়েছিলেন আমি লিখি--তাঁর আশীর্বাদে সেটুকু সম্ভব হয়েছে শুধু তাঁর দেখে যাওয়া হলো না। ছাব্বিশে মেয়ে যখন সকালে রথিন কে নিয়ে লাউঞ্জে গিয়ে বসলাম তখন মা সোফার উপরে বসে একটা শূন্য দৃষ্টি নিয়ে বাবার ঘরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। আমাদের কারুর উপস্থিতি তাঁর নজরে আসেনি। একটু পরে দেখলাম স্ট্রেচারে শুয়ে চারজন বাবার দেহ নিয়ে বাইরে আসলেন। মার সামনে কিছুক্ষণের জন্য বাবা কে রাখা হলো। আমি সমস্ত শক্তি দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বাবার ঠান্ডা পাথরের মতো শরীরকে একটু ছুঁয়ে দেখলাম। কি বলবো কি চাইব মনে আসলো না, একটা শূন্যতা তখন আমায় পুরোপুরি গ্রাস করেছে। আগের দিন রাত্তিরে লেখা কয়েকটা লাইন বাবার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে গেলাম।"চলো এবার ,সময় যে হল যাবার, এতদিন ছিল যারা কাছাকাছি তোমার সেই সব একান্ত আপনজন, আজ তারা সেই পথেই আছে দাঁড়িয়ে, তোমার প্রাণহীন দেহ যাবে যে পথ পেরিয়ে নিয়ে শুধু অশ্রুসিক্ত নয়ন"।
যত দিন যেতে লাগল বাবার স্মৃতি আমার শরীর মনকে ক্রমশ দুর্বল করতে লাগলো। সংসারের দায়-দায়িত্ব অবশ্য আমাকে বেশি দিন ওভাবে থাকতে দেয়নি ।
আমি রাত্তিরে একা বসে শুধু স্মৃতিচারণ করতাম। বাবার এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বর প্রভাব আমার উপরে পড়েছিল। আমার চারপাশের সকলেই বলতেন "তুমি একেবারে তোমার বাবার মতো" বহরমপুরে এবং কলকাতায় বাবা যখন অফিসে যেতেন তখন তাঁর সঙ্গে অতিরিক্ত সুরক্ষার জন্য একজন সিপাই এবং একজন বডিগার্ড থাকতো। মার মুখ থেকে শোনা কোন সিপাই মাকে একবার বলেছিল"মা জী, জেল কে অন্দর সাব কে ,বহোত সারি দুশমন হে, আপ চিন্তা না করো, আপকি সিন্দুর কি তাকত সে উনকা কুচ নেহি হো গা"।
বাবা পারশে মাছ খেতে খুব ভালোবাসতেন। চাকরি সূত্রে কল্যাণীতে বেশ কিছুদিন আমাদের থাকতে হয়েছিল। পারশে মাছ কিনে বাবা সোজা চলে আসতেন আমার কাছে, জিরে বাটা দিয়ে পারশে মাছের ঝোল খেয়ে আমাকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করতেন। আজো রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় মনে হয় সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরে বাবা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। দরজা খুলতে একটু দেরী হলে তার সেই গম্ভীর গলায় ডাকটা আজও কানে বাজে"খুকু আছিস ,খুকু?"
বিএ ফাইনাল পরীক্ষার আগে খাবার টেবিলে বসে মাকে একবার বলেছিলেন" খুকুকে একটু দুধ দাও ওর চোখের তলায় কালি পড়ে গেছে রাত্রে শোবার আগে অবশ্যই খাবে"।

জীবন তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে এসেছে ,আমার চোখের তলায় কালি পড়ছে কিনা তা নিয়ে ভাবার হয়তো অবকাশ কারও হয়নি।১৯৭৪ সালে আমার বড় ভাই সপরিবার এদেশে বেড়াতে এলো। সেই সময় কারুর ওপর বাবা হয়তো ততটা ভরসা করতে পারছিলেন না। আমায় 24 ঘন্টার ভিতরে বোম্বে থেকে কলকাতায় চলে আসতে হয়েছিল। মা পরে বলেছিলেন"তোমার মেম বৌদি আর বাচ্চাদের সঙ্গে সর্বক্ষণ ইংরেজিতে কে কথা বলতো? এত লোকের রান্নার ব্যবস্থা আমি একা কি করে সামলাতাম? তুমি ছাড়া আর কে বা আছে বল? তোমার ওপরে তোমার বাবার অগাধ আস্থা।"আমার আসা নিয়ে সেদিন কে কি ভাবলো তাতে বাবার কিছু আসে যায়নি। দাদা বৌদি আর বাচ্চাদের পছন্দমত রোজ দেশী বিদেশী রান্না করে ,বড় এবং ছোট পুত্রের দেখাশোনা করে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়তাম। একদিন রাত্তিরে সবাই শুয়ে পড়ার বাবা আমাকে ডেকে বললেন"ওরা কতদিন থাকবে বুঝতে পারছি না তোমার ওপর বড্ড বেশি চাপ পড়ে যাচ্ছে , আরেকজন রান্নার লোকের ব্যবস্থা করব?"দুচোখে জল নিয়ে বললাম--"দাদা আবার কবে আসতে পারবে জানি না ,ওদের জন্য এটুকু করতে পেরে আমার খুব ভালো লাগছে ।সরলার মাইনেটা একটু বাড়িয়ে দিলে ও আরেকটু সময় থাকতে পারে।"এক মুহূর্ত না ভেবে বাবা আমার প্রস্তাবে সায় দিলেন।
পরের বছর মা আমাকে এসে কটা দিন থাকতে বললেন একদিন রাত্তিরে লুচি মাংস খেতে খেতে বাবা বললেন "জানো, খুকু একদম আমার মা'র মত দেখতে"
সেদিন ভাবতে পারিনি যে ওই মানুষটি সারা জীবন আমার সামনে থাকবেন না এসব কথা বলবার জন্য। আমি ছোট বয়স থেকেই মানসিকভাবে বাবার উপর খুব নির্ভরশীল ছিলাম, তিনি আমার সবথেকে বড় অনুপ্রেরণা এবং শক্তি ছিলেন, তাই তাঁর অনুপস্থিতি কখনো মেনে নিতে পারিনি ।আজ এই পরিণত বয়সে এসে একটা গভীর শূন্যতা অনুভব করি। বারবার মনে হয় যে কত কথা বলা হয়নি, কত কিছু জিজ্ঞেস করার ছিল যা পৃথিবীর কারো কাছে বলা যাবে না, জিজ্ঞেস করতে পারবোনা। বাবা-মা এবং সাম্প্রতি আমার জ্যেষ্ঠ সন্তানকে হারিয়ে আমি আবার যেন সেই মরুভূমিতে ফিরে গেছি। মাঝে মাঝে বুকে একটা অব্যর্থ যন্ত্রণা অনুভব করি। আজ আর বাবা এসে কাউকে বলবেন না"ইউ নো, খুকু ইজ ভেরি কাইন্ড টু মি"। বাবা আমার জীবনে শীর্ষস্থানে রয়েছেন নিঃসন্দেহে, তাঁকে হারিয়ে আমি যেন অনাথ হয়ে গেছি।।