Short Stories 4 - ছোট গল্প----- আমার ছোটবেলা---

আমাকে অনেকেই প্রশ্ন করেছেন আমার ছোটবেলা কেমন ছিল। এর উত্তর দিতে গেলে প্রথমেই যে কথাটা মনে আসে সেটা হল প্রচন্ড নিয়মানুবর্তিতার ভিতর আমার ছোটবেলার শুরু হয়েছিল।ঘড়ির কাঁটা ধরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একদিকে মা অন্যদিকে বাবার কথামতো সব কিছু চলত। একটা জিনিস আমার মনের ভিতরে গেঁথে গিয়েছিলো যে সবকিছু সময়মতো করতে হবে। সকালে ঘুম থেকে উঠা আর রাত্রির শুতে যাওয়ার মাঝখানে নিয়মের নড়চড় কোথাও হত না। বলাবাহুল্য যে দশ বছর বয়স থেকেই আমার চরিত্র গঠনে এ নিয়মের মধ্যে বড় হয়ে ওঠা আমাকে সব দিক দিয়ে সাহায্য করেছে।
আমার মনে আছে যে গঙ্গার ওপার থেকে একজন ভিখারি প্রত্যেকদিন আমাদের বাড়িতে চাল আর তরকারি নিতে আসত, ধীরে ধীরে দেখলাম তারও একটা নির্দিষ্ট সময়ে আসাটা একটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল----সকাল সাড়ে 11 টার সময় আমাকে বলে দিতে হতো না আমি আগে থেকেই একটা বাটিতে চাল আর একটা খালার মধ্যে চার পাঁচ রকমের তরকারি নিয়ে গেটের সামনের দুজন অতিথির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। ছোট বয়স থেকেই আমার একটা কথা মনের ভিতরে গেঁথে গিয়েছিলো" দিও কিঞ্চিৎ না করো বঞ্চিত "
-মার শেখানো এই কথাটা আমাকে আজীবন কিছু দেওয়া নাকি মানুষের ধর্ম এটাই শিখিয়েছে।
স্কুল জীবন শুরু হতেই দেখলাম আমার হেডমিস্ট্রেস অপরাজিতা দাশগুপ্তা ধীরে ধীরে কেমন যেন বাবা-মার দায়িত্বটা নিজের উপর নিয়ে নিলেন। সকাল দশটা থেকে আর বিকেল চারটে পর্যন্ত মনে হত যেন আমি বাড়িতেই আছি। পড়াশোনার বাইরে আমার ওপর কিছু অন্যান্য কাজের দায়িত্ব ছিল, যেমন প্রত্যেকদিন ক্লাস ঠিকমতো পরিষ্কার হয়েছে কিনা, সবাই ইউনিফর্মে এসেছে কিনা, টিফিনের সময় কোন কথা না বলে নিজেদের খাবার শেষ করে আবার ক্লাসে গিয়ে বসা, এসব জিনিস গুলো আমাকে দেখতে হতো। অ্যানুয়াল স্পোর্টস এর সময় আমার দায়িত্ব আরো বেড়ে যেত। সমস্ত মেয়ের প্রত্যেকটি আইটেমই ঠিকমতো প্র্যাক্টিস হচ্ছে কিনা সেটাও আমাকে দেখতে হতো।
অন্যদিকে বাবা যেহেতু ছোটদের এবং বড়দের কারা বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন, মা আমাকে ধীরে ধীরে নাচ গানএবং নাটকের মধ্যে অংশ নিতে তৈরি করতে শুরু করে দিয়েছিলেন।

আমার ছোটবেলার স্মৃতির মধ্যে একটি ফাংশনে আর পাড়ার এক অনুষ্ঠানে আমি ডান্স ড্রামা এবং নাটক করে বেশ নাম করে ফেললাম। শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে আমাকে অনুষ্ঠানে যাবার জন্য নিমন্ত্রণ আসত, যদিও এসব জায়গায় যাবার জন্য আমার অনুমতি ছিল না। এরমধ্যে ডিস্ট্রিক্ট স্পোর্টস এর সময় মা জোর করে আমাকে যোগ দিতে পাঠালেন। এখানে আমার স্বপ্নের বাইরে ঘটনাটা ঘটলো, 11 বছর বয়সে আমি লংজাম্পে চ্যাম্পিয়ন হয়ে সার্টিফিকেট নিয়ে আসলাম। পাড়ার ক্লাবের স্পোর্টস ডে তে মা হঠাৎ বললেন "একটা জিনিস তুমি চেষ্টা করে দেখো পারো কিনা"---সেদিন জানিনা কেন আমার একটা পুরনো জামা পরে ভিখারী সেজে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলাম। এর পেছনে একটা কারণ ছিল, রাস্তাঘাটে কোন বাচ্চা মেয়েকে আমি ভিক্ষা করতে দেখতে পারতাম না তাদের জন্য সর্বদা আমার মন ভারাক্রান্ত থাকতো। এখানেও আমি প্রথম পুরস্কার নিয়ে এলাম।
ছোটবেলাকার স্মৃতির মধ্যে একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখ না করে পাচ্ছিনা একদিন। একদিন বাবা-মা মধ্যে আলোচনা থেকে বুঝতে পারলাম, কলকাতার বাইরে থেকে বাড়িতে কিছু অতিথি আসবেন। কারা আসবেন এবং কি জন্য আসবেন সেটা ধীরে ধীরে বুঝলাম। চাকরির সঙ্গে সঙ্গে বাবা তখন একজন সুপরিচিত লেখক হিসেবে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করে নিয়েছেন। বাবার লেখা লৌহ কপাট আমার পড়া হয়নি কিন্তু সেটা যে জেলের ভেতরে যারা বন্দি আছে তাদের নিয়ে লেখা সেটুকু মার কাছ থেকে শুনেছিলাম, মার কাছ থেকেই জানতে পারলাম যে সেই ব্যাপারে একজন লেখক একজন সিনেমার পরিচালক আর একজন অভিনেত্রী খুব শিগগিরই আমাদের বাড়িতে আসছেন।যাইহোক সমস্ত ব্যাপারটা বুঝতে আমার বেশ কিছু সময় লেগে গেল। বাবা-মা তিনজনকে নিয়ে বাবা মা খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তাই আমার ভিতরে কি প্রতিক্রিয়া হচ্ছে সেটা নিয়ে তাদের ভাবার সময় ছিল না ।
কদিন পরে দেখলাম মা জামা কাপড় স্যুটকেসে রাখতে রাখতে বললেন আমাদের কদিনের জন্য কলকাতা যেতে হবে। এটা কলকাতার অতিথিদের যাবার প্রায় এক বছর পরের ঘটনা, বুঝলাম ছবি তৈরির কাজ শেষ, আমরা এবার সেটা সিনেমা হলে দেখতে পারবো। সেদিন খুব আনন্দ হয়েছিল। প্রথম কথা কলকাতায় প্রথমবার যাচ্ছি আর দ্বিতীয় কথা এটা একটা নতুন অভিজ্ঞতা হবে, তাড়াতাড়ি করে নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলাম, চারিদিকে সবাইকে আমার তখন বলা হয়ে গিয়েছিল যে আমি কলকাতা যাচ্ছি। কলকাতায় পৌঁছে নির্দিষ্ট দিনে আমরা ভবানীপুরের ভারতী সিনেমা হলে পৌছে গেলাম। সিনেমা শেষ হবার পর আমাদের অনেক ছবি তোলা হলো আর বাইরের বহু লোক আমাদের সঙ্গে কথাও বললেন। যাই হোক কলকাতা থেকে ফিরে এসে আমার চেনা পরিচিতদের ভেতরে কারুর জানতে বাকি রইল না আমার এক অভিনব অভিজ্ঞতার কথা।, এর কদিন পরেই জানতে পারলাম বাবার কলকাতাতে ট্রানস্ফার অডার এসে গেছে, বলাবাহুল্য এটা শুনে আমার এত আনন্দ হল এটা যদি কলকাতা না হয়ে অন্য কোথাও হত তাহলে আমি এত খুশি হতাম না। মা যাবার জন্য তৈরি শুরু করে দিলেন, অন্যদিকে বহরমপুর আর আমার বন্ধু বান্ধবদের ছেড়ে যেতে আমার একটু কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু কিছু করার নেই চাকরি বলে ব্যাপার! ওরি মধ্যে আমি একদিন স্কুলে গিয়ে হেডমিস্ট্রেস এবং বাকি টিচারদের সঙ্গে দেখা করে এলাম। হেড মিস আমার জন্য গিফট রেখেছিলেন সেটা নিয়ে আসলাম।দেখতে দেখতে আমাদের যাবার দিন এগিয়ে এলো সেদিন মনটা খুব খারাপ লাগছিল, যাই হোক কলকাতায় সব কিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে আমার বেশ কিছু সময় লেগে গেছিল, ধীরে ধীরে দেখলাম যে কলকাতাকে আমি বহরমপুর এর মতনই ভালোবেসে ফেলেছি।
যাই হোক আমার ছোটবেলাকার এই টক-ঝাল মেশানো অভিজ্ঞতাগুলো আমাকে অবসর সময়ে সেই দিনগুলো তে ফেরত নিয়ে যায়, আজ এই পরিণত বয়সেও মনের মধ্যে প্রতিটি ঘটনা আমাকে অসম্ভব আনন্দ দেয়। সত্যিই আমার ছোটবেলা আমার কাছে এক বিরাট সম্পদ।